বাসন্তি শাড়ি,একটি গোলাপ ও বাবুই
By- এম এস কে তাম্মিন
(১)
রাত নয়টা কি দশটা বাজে।আনন্দ সিনেমা হলের নিচে এসে দাঁড়ালাম।সিগারেট বিক্রেতার কাছে এগিয়ে গেলাম।
-মামু,একটা বেনসন লাইট দেও তো।
-লন মামা।
-লাইটার টা দাও।
লাইটারটা নিলাম।সিগারেটের ফিল্টারটা দু ঠোটের মাঝে রাখলাম।লাইটারের চাকাটা ঘুরিয়ে আগুনজ্বালালাম।সিগারেটের সামনের অংশটার কিছু অংশ পোড়ালাম।বিরাট এক টান দিলাম।প্রায় ৬ কি ৭ মাস পর টানছি।হালকা কাশি বের হলো।ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে গেল।এবার বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে টানতে লাগলাম।সুখ টান।হটাত্ নিজের গালে চড় নামক জিনিসটার স্পর্শ পেলাম।সিগারেটটা আরো জোড়ে দু ঠোঁটেরমাঝে চেপে বসল।সামনে তাকালাম।দেখি সিগারেট বিক্রেতা হাসছে।বেশ রাগ হল।ইচ্ছে হলো ব্যাটাকে দি একটা!অনেক কষ্টে তা নিবারণ করলাম।এবার চড়ের উত্সের দিকে তাকালাম।সাথে সাথে ভূত দেখার মত চমকে উঠলাম।এ আমি কাকে দেখছি!এ এত রাতে এখানে কি করছে!গাল ধরে তাকিয়ে আছি।দু হাত কোমড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ক্ষেপে ব্যোম হয়ে আছে বোঝা যাচ্ছে।হটাত্ হাতে টান খেলাম।আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।কি যে হয় তাই চিন্তা করতেছি।
(২)
-এই রিক্সা যাবে?
-কই যাবেন আফা?
-পশ্চিম রাজাবাজার।
আরে এখানে তো আমি থাকি।ও তো থাকে ধানমন্ডিতে।রাজা বাজারে ওর কি কাজ!অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছি।সিগারেটের টান দিতে ভুলে গেছি।
-কি ব্যাপার ওঠ না কেনো?নাকি আরেকটা থাপ্পড় দিতে হবে?আর সিগারেটটা ফেলবা নাকি মুখের উপর দিবো এক লাথি?
আরে এই মেয়ে বলে কি!পুরা দেখি দজ্জ্বাল মেয়ে!
-মামু,সিগারেটটা না ফেইলা আমারে দেন,টাইনা লই।নষ্ট করনের দরকার কি!
হেসে হেসে কথাটা বলে রিক্সাওয়ালা।রিক্সাওয়ালার কথা শুনে রাগ ২য় আকাশে চড়ে
বসল!এদ্দিন পর সুখ টান দিতেছি আর এই সময়ও বাধা পাইছি।এই সময় রিক্সাওয়ালার
মসকরা কেমনে সহ্য হয়!আগুন দৃষ্টি হানলাম রিক্সাওয়ালার দিকে। ঠাশ্।!সশব্দে আরেকটা চড়।গালে হাত দিলাম।চামড়া জ্বলছে।অবশ্য চড় খাইয়া খুশিই হইছি।ঐসময় খেয়েছিলাম ডান গালে আর এখন বাম গালে।এক গালে চড় খাইলে নাকি বিয়া হয় না।দুই গালে খাইছি তারমানে বিবাহ আমার সুনিশ্চিত!
-তোমার কান ধরে উঠাতে হবে নাকি নিজে নিজেই উঠবে?
আশেপাশে তাকিয়ে দেখি অন্যান্য লোকেরাআমার এই দুর্দশার মজা নিচ্ছে।কিচ্ছু করতে পারতেছি না।আর দেরি করলাম না।একে আমি ভালো করেই চিনি।দুইগালে অলরেডি দিয়ে দিয়েছে এখন দেরি করলে মুখে নিশ্চিত বক্সিং চালাবে।আধ খাওয়াসিগারেট রাস্তায় ফেলে পায়ের চাপে আগুন নিভিয়ে রিক্সাতে উঠে পড়লাম।যেতেযেতে যে আরো কি হয় আল্লাহ মালুম!
(৩)
রিক্সায় বসে আছি।পাশে তো তিনি আছেনই।পূর্ব রাজাবাজার মসজিদের কাছে চলে এসেছি।কিন্তু একটা কথাও বলি নি এখন পর্যন্ত।তার নিঃশ্বাসের ছাড়ার ঘনঘন অস্তিত্ব টের পাচ্ছি।বুঝতে পারছি ভেতরে ভেতরে রাগে ফুলে গেছেন। হটাত্ হাতে জোড়ালো একটা চিমটি খেলাম।নখ দিয়ে চিমটি না দিয়ে কাঁকড়া চিমটি দিয়েছে।চামড়ার অবস্থা দফারফা করে ফেলছে।
-কি ব্যাপার কথা বলছ না কেনো?নাকি ঘুষি দিতে হবে!
আর মুখ বন্ধ করে থাকা যাবে না।কথা না বললে শিউর ঘুষি মেরে বসবে।প্রথমেই প্রশ্ন করলাম,
-তুমি এত রাতে বাইরে কি করছ?
-এক ঘুষিতে নাক ফাটাই দিবো!বাড়ি থেকে লাপাত্তা কয়দিন ধরে তা কি ভুলে গেছো?
-বেশিদিন না।মাত্র ২ সপ্তাহ!
-দুই সপ্তাহ তো তোমার কাছে কিছুই না।কিন্তু আমার কাছে?তোমার যদি কিছু হয় তাহলে আমার.....
ও আর কথা বলতে পারল না।ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।খুব ইচ্ছে করছে চোখের পানি মুছে দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরি আর বলি-
'আমি কোথাও হারিয়ে যাই নি।আমার বাবুইকে ছেড়ে কি আমি থাকতে পারি!'
কিন্তু পারলাম না।এ মেয়েটা আমাকে অসম্ভব রকমের ভালোবাসে।আমি যে বাসি না তা কিন্তু না।ও তার ভালোবাসাক প্রকাশ করার জন্য সবসময় উদগ্রীব থাকে ,আমিও চাই প্রকাশ করতে।কিন্তু কোথায় গিয়ে যেন আঁটকে যাই।
পরিচয় হয়েছে মাস এক আগে।পারিবারিক ভাবেই।বাড়ি থেকে বিয়ের কথা বলছিলো।মোটকথা একটা প্রেশারের মধ্যেই ছিলাম।কিন্তু আমি বিয়ে করতে চাচ্ছিলাম না।আমি যে কারণটা দাঁড় করাচ্ছি তা বলতে গেলে অনেকের কাছে খোঁড়া যুক্তি মনে হতে পারে।কিন্তু আমার কাছে তা মনে হয় না।আমি শারিরীক দিকে দিয়ে অনেক অসুস্থ।আমার কোন সময় কি হয়ে যায় বলা যায় না।দেখা গেলো আমি ওকে বিয়ে করলাম তার এক মাস পরেই মারা গেলাম।শুধু শুধু একটা মেয়েকে কষ্ট দেয়ার কোন মানে হয় না।তারচেয়ে আমি একা আছি একাই থাকি।কোন মায়ার বাঁধন নেই।
ওকে যেদিন দেখতে গিয়েছিলাম সেদিন এগুলো বলেছিলাম।এরপর থেকেই পিছে লেগেছে।আমাকেই বিয়ে করবে।যদি আমি বিয়ের রাতেই মারা যাই তাও!ও আমার হাত ধরে থাকতে চায়।সেটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও।
তাকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।বলেছিলাম সে কি করুণা দেখাচ্ছে!কিন্তু তাকে আমি কোন কথা দ্বারাই সরাতে পারি নি।সে অনড় ছিলো।
বাবা মায়ের চাপে তাই আংটি বদল করতে হয়েছিলো।ঐদিন ওর হাসিতে উদ্ভাসিত মুখ দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।ওর চেহারা দেখে মনে হয়েছিলো ও তার কাঙ্খিত স্বপ্ন হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছে।
এরপর থেকে আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে।যেভাবে পেরেছে ভালোবাসা প্রকাশ করেছে। তারপর হুট করে হারিয়ে যাই।২ সপ্তাহের মত বাড়ি ছিলাম না।
হটাত্ ও আমাকে জড়িয়ে ধরায় বাস্তবে ফিরে এলাম।কাঁদছে এখনো।
-আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।প্লিজ আর ছেড়ে যেও না।
রিক্সা রনদা ফার্মেসির কাছে এসে থামল।ভাড়া দিলাম।মানিব্যাগটা পকেটে পুরে রাখলাম।তারপর তার হাতটা ধরলাম।বেশ লক্ত করেই।ও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো।আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কি যেন খুঁজছে।আমার হাতটাও ও জড়িয়ে ধরল।দুজন দুজনের হাত ধরে হাঁটছি।ও আমার হাত ধরে হাঁটছে পরম নির্ভরতায়।
(৪)
সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছি।দুজনের কেউই এখনো কারো হাত ছাড়ি নি। দরজায় কড়া নাড়লাম।সাথে সাথেই দরজা খুলে গেলো।মনে হল আমার অপেক্ষায়ই দরজার কাছে বসে ছিলো। মাকে দেখে আমি চমকে উঠলাম।মা কেমন যেন শুকিয়ে গেছে।চোখের নিচে কালি জমে আছে।চোখ দুটো লাল হয়ে আছে।আমার নিজেরই খারাপ লাগতে শুরু করল।মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলাম। -মা,তোমার এই অবস্থা কেনো?আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি তাই না!আর কোনদিনও কষ্ট দিবো না।আর কোনদিনও এভাবে চলে যাবো না। মাও আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। -বউমা,যাও রুমে যাও।ফ্রেশ হয়ে আসো তোমরা।একসাথে খাবো। মায়ের কথা শুনে চমকে উঠলাম।
-মা তোমরা এখনো খাও নি?
-তোকে ছাড়া কিভাবে খাই বল!
আর থাকতে পারলাম না।সোজা বাথরুমে চলে গেলাম।ঝরনা ছেডে দিলাম।চোখের পানি বাঁধ মানছে না।কেঁদেই চলেছি।
-এই তাড়াতাড়ি বের হও।আম্মা ভাত বেড়ে বসে আছে।
-আসছি,যাও।
একসাথে থেতে বসলাম।আম্মা আমাকে খাইয়ে দিতে চাইলেন।মানা করতে পারলাম না।চোখের পানি বাঁধা না মেনে বের হয়ে আসলো।যে মা আমাকে এত ভালোবাসে তাকে আমি কিভাবে কষ্ট দিয়ে থাকতে পারলাম!
-কিরে কাঁদছিস কেনো?
-না মা,এমনিই।
খাওয়া দাওয়া করে ওকে নিয়ে রুমে আসলাম।ও দেখি বিছানা ঠিক করছে।আমি বারান্দায় গেলাম।আজ ভরা জ্যোত্স্না।
-বারান্দায় আসো তো।
-কি ব্যাপার!
-আজ ভরা জ্যোত্স্না।তুমি দেখবে?
আমি জানি ও আমার এই আচরণে অবাক হয়েছে। কোন কথা না বলে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো।দুজনে হাত ধরে দেখতে লাগলাম জ্যোৎস্না ভরা রাতের সৌন্দর্য।
(৫)
কাল পহেলা ফাল্গুন।ঠিক করেছি বাবুইকে চমকে দেবো।তাকে একটা বাসন্তী শাড়ি উপহার দিবো।ওর প্রতি আমার ভালোবাসা প্রকাশের একটা প্রতীক হয়ে থাকবে শাড়িটা।ও নিশ্চয়ই অনেক খুশি হবে। আরেকটা প্ল্যান আছে।তার পরের দিন ১৪ই ফেব্রুয়ারি।ঠিক রাত ১২ টার সময় ওকে আমি প্রেমিক প্রেমিকাকে যেভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করে সেভাবে ওকে প্রপোজ করব।শুয়ে শুয়ে ভাবছি এসব।মনটা আনন্দে ভরে উঠলো।বাবুইটার মুখের হাসি কল্পনায় দেখতে পেলাম।মায়াবী,স্নিগ্ধ এক হাসি।অদ্ভূত এক ভালোলাগায় মনটা ভরে উঠলো। বাবুই রেডি হয়ে আছে।আজ ওকে নিয়ে সারাদিন ঘুরবো।কাল রাতে যখন ওকে কথাটা বলেছিলাম ওর চেহারায় আমি এক অদ্ভূত আনন্দ লক্ষ্য করেছিলাম। দুজন দুজনের হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামলাম।ও পরম নির্ভতায় আর ভালোবাসার আবেশে জড়িয়ে ধরে আছে আমার হাত। সারাটা দিন অনেক ভালো কাটলো।আমার কাছে মনে হল আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ট একটা দিন কাটিয়েছি।সন্ধ্যায় ওকে বাড়িতে পৌঁছে দিলাম।ওকে যখন বিদায় দিচ্ছে আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।কি যেন হারিয়ে ফেলছি মনে হল।খেয়াল করলাম ওর চোখ ছলছল করছে।ওর ও যে কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি।বারবার পিছনে ফিরে তাকাচ্ছে।কষ্ট করে হাসতে চেষ্টা করছে আর হাত নাড়ছে।
এবার আমার প্ল্যানটা সফল করতে হবে।রিক্সা নিয়ে গেলাম শপিং মলের দিকে।একটা শাড়ি আগে থেকেই পছন্দ করা ছিলো।শাড়ির পাড়টা ছিলো নীল রংয়ের।নীল অংশটার উপর চিকন করে লাল রংয়ের একটা ডিজাইন আছে।আর বাকি অংশ ছিলো হলুদ।শাড়িটা কিনে বের হয়ে আসলাম শপিং মল থেকে।শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছি শাড়ির প্যাকেটটাকে।অদ্ভূত এক ভালোলাগা বিরাজ করছে।পা বাড়ালাম ফুল দোকানের দিকে।গোলাপ ফুল কিনবো।টকটকে লাল একটা গোলাপ কিনলাম।ডানহাতে গোলাপটা আর বাম হাতে শাড়ির প্যাকেটা ধরা।ফুটপাত থেকে রাস্তায় নামলাম।রাস্তা পার হয়ে ওপাশে যেতে হবে।রাস্তার মাঝে চলে এসেছি।হটাত্ বেশ জোরে একটা ধাক্কা খেলাম।সাথে সাথে মাটিতে পড়ে গেলাম।কয়েক পাকগড়ালাম।শাড়ি আর গোলাপটা আমি তখনও ধরে রেখেছি।কিন্তু শেষে আর পারলাম না।
চোখের কোণ বেয়ে কি যেন নেমে আসলো।ঝাপসা হয়ে আসছে সব কিছু।মাত্র এক হাত দূরে শাড়ির প্যাকেটটা পড়ে আছে।তার ঠিক উপরেই গোলাপ ফুলটা।আমার বাবুই এর বাসন্তী শাড়ি আর গোলাপটা।
(৬)
এইটুকু বলে থামলেন মিসেস সামিহা।বুক থেকে চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসল।
-মা থামলে কেনো!পরে কি হয়েছে বল না।
-এখানেই গল্প শেষ।এরপর কি হয়েছে জানি নারে মা।
-মা,এটা কি তোমার পরিচিত কারো ঘটনা?
-আরে না,এটা শুধুই একটা গল্প।
মলিন এক হাসি দিয়ে কথাটা বলল সামিহা।
-যারে মা,তুই গোসল করে আয়।একসাথে খাবো।
-আচ্ছা যাচ্ছি। মেয়েকে বিদায় দিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন সামিহা।হটাত্ তার চোখ পড়ল বারান্দার একেবারে কোণার গ্রিলের দিকে।সেখানে দুটো বাবুই বসে আছে।আর কিচির মিচির করে ডাকছে।একজন আরেকজনকে ঠোকরাচ্ছে।সামিহা নিষ্পলক পাখি দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল।মনে মনে বলছে
"আজ তুমি থাকলে এই দুটো বাবুই পাখির মতই থাকতাম।তুমি ডাকতে বাবুই বলে।আর আমি সে ডাকে ছুটে এসে নিজকে জড়িয়ে নিতাম তোমার বাহুডোরে।
সবাই ভালো থাকবেন।
By- এম এস কে তাম্মিন
(১)
রাত নয়টা কি দশটা বাজে।আনন্দ সিনেমা হলের নিচে এসে দাঁড়ালাম।সিগারেট বিক্রেতার কাছে এগিয়ে গেলাম।
-মামু,একটা বেনসন লাইট দেও তো।
-লন মামা।
-লাইটার টা দাও।
লাইটারটা নিলাম।সিগারেটের ফিল্টারটা দু ঠোটের মাঝে রাখলাম।লাইটারের চাকাটা ঘুরিয়ে আগুনজ্বালালাম।সিগারেটের সামনের অংশটার কিছু অংশ পোড়ালাম।বিরাট এক টান দিলাম।প্রায় ৬ কি ৭ মাস পর টানছি।হালকা কাশি বের হলো।ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে গেল।এবার বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে টানতে লাগলাম।সুখ টান।হটাত্ নিজের গালে চড় নামক জিনিসটার স্পর্শ পেলাম।সিগারেটটা আরো জোড়ে দু ঠোঁটেরমাঝে চেপে বসল।সামনে তাকালাম।দেখি সিগারেট বিক্রেতা হাসছে।বেশ রাগ হল।ইচ্ছে হলো ব্যাটাকে দি একটা!অনেক কষ্টে তা নিবারণ করলাম।এবার চড়ের উত্সের দিকে তাকালাম।সাথে সাথে ভূত দেখার মত চমকে উঠলাম।এ আমি কাকে দেখছি!এ এত রাতে এখানে কি করছে!গাল ধরে তাকিয়ে আছি।দু হাত কোমড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।ক্ষেপে ব্যোম হয়ে আছে বোঝা যাচ্ছে।হটাত্ হাতে টান খেলাম।আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।কি যে হয় তাই চিন্তা করতেছি।
(২)
-এই রিক্সা যাবে?
-কই যাবেন আফা?
-পশ্চিম রাজাবাজার।
আরে এখানে তো আমি থাকি।ও তো থাকে ধানমন্ডিতে।রাজা বাজারে ওর কি কাজ!অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছি।সিগারেটের টান দিতে ভুলে গেছি।
-কি ব্যাপার ওঠ না কেনো?নাকি আরেকটা থাপ্পড় দিতে হবে?আর সিগারেটটা ফেলবা নাকি মুখের উপর দিবো এক লাথি?
আরে এই মেয়ে বলে কি!পুরা দেখি দজ্জ্বাল মেয়ে!
-মামু,সিগারেটটা না ফেইলা আমারে দেন,টাইনা লই।নষ্ট করনের দরকার কি!
হেসে হেসে কথাটা বলে রিক্সাওয়ালা।রিক্সাওয়ালার কথা শুনে রাগ ২য় আকাশে চড়ে
বসল!এদ্দিন পর সুখ টান দিতেছি আর এই সময়ও বাধা পাইছি।এই সময় রিক্সাওয়ালার
মসকরা কেমনে সহ্য হয়!আগুন দৃষ্টি হানলাম রিক্সাওয়ালার দিকে। ঠাশ্।!সশব্দে আরেকটা চড়।গালে হাত দিলাম।চামড়া জ্বলছে।অবশ্য চড় খাইয়া খুশিই হইছি।ঐসময় খেয়েছিলাম ডান গালে আর এখন বাম গালে।এক গালে চড় খাইলে নাকি বিয়া হয় না।দুই গালে খাইছি তারমানে বিবাহ আমার সুনিশ্চিত!
-তোমার কান ধরে উঠাতে হবে নাকি নিজে নিজেই উঠবে?
আশেপাশে তাকিয়ে দেখি অন্যান্য লোকেরাআমার এই দুর্দশার মজা নিচ্ছে।কিচ্ছু করতে পারতেছি না।আর দেরি করলাম না।একে আমি ভালো করেই চিনি।দুইগালে অলরেডি দিয়ে দিয়েছে এখন দেরি করলে মুখে নিশ্চিত বক্সিং চালাবে।আধ খাওয়াসিগারেট রাস্তায় ফেলে পায়ের চাপে আগুন নিভিয়ে রিক্সাতে উঠে পড়লাম।যেতেযেতে যে আরো কি হয় আল্লাহ মালুম!
(৩)
রিক্সায় বসে আছি।পাশে তো তিনি আছেনই।পূর্ব রাজাবাজার মসজিদের কাছে চলে এসেছি।কিন্তু একটা কথাও বলি নি এখন পর্যন্ত।তার নিঃশ্বাসের ছাড়ার ঘনঘন অস্তিত্ব টের পাচ্ছি।বুঝতে পারছি ভেতরে ভেতরে রাগে ফুলে গেছেন। হটাত্ হাতে জোড়ালো একটা চিমটি খেলাম।নখ দিয়ে চিমটি না দিয়ে কাঁকড়া চিমটি দিয়েছে।চামড়ার অবস্থা দফারফা করে ফেলছে।
-কি ব্যাপার কথা বলছ না কেনো?নাকি ঘুষি দিতে হবে!
আর মুখ বন্ধ করে থাকা যাবে না।কথা না বললে শিউর ঘুষি মেরে বসবে।প্রথমেই প্রশ্ন করলাম,
-তুমি এত রাতে বাইরে কি করছ?
-এক ঘুষিতে নাক ফাটাই দিবো!বাড়ি থেকে লাপাত্তা কয়দিন ধরে তা কি ভুলে গেছো?
-বেশিদিন না।মাত্র ২ সপ্তাহ!
-দুই সপ্তাহ তো তোমার কাছে কিছুই না।কিন্তু আমার কাছে?তোমার যদি কিছু হয় তাহলে আমার.....
ও আর কথা বলতে পারল না।ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।খুব ইচ্ছে করছে চোখের পানি মুছে দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরি আর বলি-
'আমি কোথাও হারিয়ে যাই নি।আমার বাবুইকে ছেড়ে কি আমি থাকতে পারি!'
কিন্তু পারলাম না।এ মেয়েটা আমাকে অসম্ভব রকমের ভালোবাসে।আমি যে বাসি না তা কিন্তু না।ও তার ভালোবাসাক প্রকাশ করার জন্য সবসময় উদগ্রীব থাকে ,আমিও চাই প্রকাশ করতে।কিন্তু কোথায় গিয়ে যেন আঁটকে যাই।
পরিচয় হয়েছে মাস এক আগে।পারিবারিক ভাবেই।বাড়ি থেকে বিয়ের কথা বলছিলো।মোটকথা একটা প্রেশারের মধ্যেই ছিলাম।কিন্তু আমি বিয়ে করতে চাচ্ছিলাম না।আমি যে কারণটা দাঁড় করাচ্ছি তা বলতে গেলে অনেকের কাছে খোঁড়া যুক্তি মনে হতে পারে।কিন্তু আমার কাছে তা মনে হয় না।আমি শারিরীক দিকে দিয়ে অনেক অসুস্থ।আমার কোন সময় কি হয়ে যায় বলা যায় না।দেখা গেলো আমি ওকে বিয়ে করলাম তার এক মাস পরেই মারা গেলাম।শুধু শুধু একটা মেয়েকে কষ্ট দেয়ার কোন মানে হয় না।তারচেয়ে আমি একা আছি একাই থাকি।কোন মায়ার বাঁধন নেই।
ওকে যেদিন দেখতে গিয়েছিলাম সেদিন এগুলো বলেছিলাম।এরপর থেকেই পিছে লেগেছে।আমাকেই বিয়ে করবে।যদি আমি বিয়ের রাতেই মারা যাই তাও!ও আমার হাত ধরে থাকতে চায়।সেটা কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও।
তাকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।বলেছিলাম সে কি করুণা দেখাচ্ছে!কিন্তু তাকে আমি কোন কথা দ্বারাই সরাতে পারি নি।সে অনড় ছিলো।
বাবা মায়ের চাপে তাই আংটি বদল করতে হয়েছিলো।ঐদিন ওর হাসিতে উদ্ভাসিত মুখ দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।ওর চেহারা দেখে মনে হয়েছিলো ও তার কাঙ্খিত স্বপ্ন হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছে।
এরপর থেকে আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছে।যেভাবে পেরেছে ভালোবাসা প্রকাশ করেছে। তারপর হুট করে হারিয়ে যাই।২ সপ্তাহের মত বাড়ি ছিলাম না।
হটাত্ ও আমাকে জড়িয়ে ধরায় বাস্তবে ফিরে এলাম।কাঁদছে এখনো।
-আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।প্লিজ আর ছেড়ে যেও না।
রিক্সা রনদা ফার্মেসির কাছে এসে থামল।ভাড়া দিলাম।মানিব্যাগটা পকেটে পুরে রাখলাম।তারপর তার হাতটা ধরলাম।বেশ লক্ত করেই।ও অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো।আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কি যেন খুঁজছে।আমার হাতটাও ও জড়িয়ে ধরল।দুজন দুজনের হাত ধরে হাঁটছি।ও আমার হাত ধরে হাঁটছে পরম নির্ভরতায়।
(৪)
সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছি।দুজনের কেউই এখনো কারো হাত ছাড়ি নি। দরজায় কড়া নাড়লাম।সাথে সাথেই দরজা খুলে গেলো।মনে হল আমার অপেক্ষায়ই দরজার কাছে বসে ছিলো। মাকে দেখে আমি চমকে উঠলাম।মা কেমন যেন শুকিয়ে গেছে।চোখের নিচে কালি জমে আছে।চোখ দুটো লাল হয়ে আছে।আমার নিজেরই খারাপ লাগতে শুরু করল।মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিলাম। -মা,তোমার এই অবস্থা কেনো?আমি অনেক কষ্ট দিয়েছি তাই না!আর কোনদিনও কষ্ট দিবো না।আর কোনদিনও এভাবে চলে যাবো না। মাও আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। -বউমা,যাও রুমে যাও।ফ্রেশ হয়ে আসো তোমরা।একসাথে খাবো। মায়ের কথা শুনে চমকে উঠলাম।
-মা তোমরা এখনো খাও নি?
-তোকে ছাড়া কিভাবে খাই বল!
আর থাকতে পারলাম না।সোজা বাথরুমে চলে গেলাম।ঝরনা ছেডে দিলাম।চোখের পানি বাঁধ মানছে না।কেঁদেই চলেছি।
-এই তাড়াতাড়ি বের হও।আম্মা ভাত বেড়ে বসে আছে।
-আসছি,যাও।
একসাথে থেতে বসলাম।আম্মা আমাকে খাইয়ে দিতে চাইলেন।মানা করতে পারলাম না।চোখের পানি বাঁধা না মেনে বের হয়ে আসলো।যে মা আমাকে এত ভালোবাসে তাকে আমি কিভাবে কষ্ট দিয়ে থাকতে পারলাম!
-কিরে কাঁদছিস কেনো?
-না মা,এমনিই।
খাওয়া দাওয়া করে ওকে নিয়ে রুমে আসলাম।ও দেখি বিছানা ঠিক করছে।আমি বারান্দায় গেলাম।আজ ভরা জ্যোত্স্না।
-বারান্দায় আসো তো।
-কি ব্যাপার!
-আজ ভরা জ্যোত্স্না।তুমি দেখবে?
আমি জানি ও আমার এই আচরণে অবাক হয়েছে। কোন কথা না বলে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো।দুজনে হাত ধরে দেখতে লাগলাম জ্যোৎস্না ভরা রাতের সৌন্দর্য।
(৫)
কাল পহেলা ফাল্গুন।ঠিক করেছি বাবুইকে চমকে দেবো।তাকে একটা বাসন্তী শাড়ি উপহার দিবো।ওর প্রতি আমার ভালোবাসা প্রকাশের একটা প্রতীক হয়ে থাকবে শাড়িটা।ও নিশ্চয়ই অনেক খুশি হবে। আরেকটা প্ল্যান আছে।তার পরের দিন ১৪ই ফেব্রুয়ারি।ঠিক রাত ১২ টার সময় ওকে আমি প্রেমিক প্রেমিকাকে যেভাবে ভালোবাসা প্রকাশ করে সেভাবে ওকে প্রপোজ করব।শুয়ে শুয়ে ভাবছি এসব।মনটা আনন্দে ভরে উঠলো।বাবুইটার মুখের হাসি কল্পনায় দেখতে পেলাম।মায়াবী,স্নিগ্ধ এক হাসি।অদ্ভূত এক ভালোলাগায় মনটা ভরে উঠলো। বাবুই রেডি হয়ে আছে।আজ ওকে নিয়ে সারাদিন ঘুরবো।কাল রাতে যখন ওকে কথাটা বলেছিলাম ওর চেহারায় আমি এক অদ্ভূত আনন্দ লক্ষ্য করেছিলাম। দুজন দুজনের হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামলাম।ও পরম নির্ভতায় আর ভালোবাসার আবেশে জড়িয়ে ধরে আছে আমার হাত। সারাটা দিন অনেক ভালো কাটলো।আমার কাছে মনে হল আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ট একটা দিন কাটিয়েছি।সন্ধ্যায় ওকে বাড়িতে পৌঁছে দিলাম।ওকে যখন বিদায় দিচ্ছে আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।কি যেন হারিয়ে ফেলছি মনে হল।খেয়াল করলাম ওর চোখ ছলছল করছে।ওর ও যে কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি।বারবার পিছনে ফিরে তাকাচ্ছে।কষ্ট করে হাসতে চেষ্টা করছে আর হাত নাড়ছে।
এবার আমার প্ল্যানটা সফল করতে হবে।রিক্সা নিয়ে গেলাম শপিং মলের দিকে।একটা শাড়ি আগে থেকেই পছন্দ করা ছিলো।শাড়ির পাড়টা ছিলো নীল রংয়ের।নীল অংশটার উপর চিকন করে লাল রংয়ের একটা ডিজাইন আছে।আর বাকি অংশ ছিলো হলুদ।শাড়িটা কিনে বের হয়ে আসলাম শপিং মল থেকে।শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছি শাড়ির প্যাকেটটাকে।অদ্ভূত এক ভালোলাগা বিরাজ করছে।পা বাড়ালাম ফুল দোকানের দিকে।গোলাপ ফুল কিনবো।টকটকে লাল একটা গোলাপ কিনলাম।ডানহাতে গোলাপটা আর বাম হাতে শাড়ির প্যাকেটা ধরা।ফুটপাত থেকে রাস্তায় নামলাম।রাস্তা পার হয়ে ওপাশে যেতে হবে।রাস্তার মাঝে চলে এসেছি।হটাত্ বেশ জোরে একটা ধাক্কা খেলাম।সাথে সাথে মাটিতে পড়ে গেলাম।কয়েক পাকগড়ালাম।শাড়ি আর গোলাপটা আমি তখনও ধরে রেখেছি।কিন্তু শেষে আর পারলাম না।
চোখের কোণ বেয়ে কি যেন নেমে আসলো।ঝাপসা হয়ে আসছে সব কিছু।মাত্র এক হাত দূরে শাড়ির প্যাকেটটা পড়ে আছে।তার ঠিক উপরেই গোলাপ ফুলটা।আমার বাবুই এর বাসন্তী শাড়ি আর গোলাপটা।
(৬)
এইটুকু বলে থামলেন মিসেস সামিহা।বুক থেকে চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসল।
-মা থামলে কেনো!পরে কি হয়েছে বল না।
-এখানেই গল্প শেষ।এরপর কি হয়েছে জানি নারে মা।
-মা,এটা কি তোমার পরিচিত কারো ঘটনা?
-আরে না,এটা শুধুই একটা গল্প।
মলিন এক হাসি দিয়ে কথাটা বলল সামিহা।
-যারে মা,তুই গোসল করে আয়।একসাথে খাবো।
-আচ্ছা যাচ্ছি। মেয়েকে বিদায় দিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন সামিহা।হটাত্ তার চোখ পড়ল বারান্দার একেবারে কোণার গ্রিলের দিকে।সেখানে দুটো বাবুই বসে আছে।আর কিচির মিচির করে ডাকছে।একজন আরেকজনকে ঠোকরাচ্ছে।সামিহা নিষ্পলক পাখি দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল।মনে মনে বলছে
"আজ তুমি থাকলে এই দুটো বাবুই পাখির মতই থাকতাম।তুমি ডাকতে বাবুই বলে।আর আমি সে ডাকে ছুটে এসে নিজকে জড়িয়ে নিতাম তোমার বাহুডোরে।
সবাই ভালো থাকবেন।
No comments:
Post a Comment